আল্লাহর কিছু বানী ও আদেশ নিষেধ
আল্লাহর বাণী ও আদেশ-নিষেধ
ইসলামী জীবনবিধি: করণীয় ও বর্জনীয়
📖 ভূমিকা
পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে তিনি সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে দীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মানবজাতির জন্য রহমত ও মুক্তির পথ। নিচে আল্লাহর কিছু বাণী, পবিত্র কাজের নির্দেশ এবং হারাম বিষয়সমূহ তুলে ধরা হয়েছে। সাথে সাথে ইসলামী অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় 'ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়ম-কানুন' বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে, যেন মুসলিম সমাজ সুদ-ঘুষ ও প্রতারণামুক্ত লেনদেনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।
আল্লাহ সমস্ত জীবনকে নির্দেশ দেন এবং নির্দেশ ব্যতীত কাজ করা নিষেধ। কিছু আদেশ এবং নিষেধ নিচে উল্লেখ করা হলো: সত্য বলুন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কথা বলবেন না। কখনও কারো জীবন ধ্বংস করবেন না। আল্লাহ কুরআনে বলেন, "কেউ একটি জীবন ধ্বংস করলে সে সমস্ত মানবজাতি ধ্বংস করে।" কুরআনে আল্লাহ বলেন, "হে মানুষগণ! তোমরা সত্যিই আল্লাহর দিকে তাকাবে এবং রসূলের (মুহাম্মদ সা.) পাশে থাকো ও সুন্নত অনুসরণ কর। তাহলে তোমরা রহমত পাবে।" [সূরা আল-আরাফ ৭:২০০] এছাড়াও কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ আমাদেরকে নেক কাজ করতে আদেশ দিয়েছেন এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ সব জানে।" [সূরা আল-বাকারা ২:২০২]
ক্রয়-বিক্রয়ের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
আরবী 'বাই' শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ 'ক্রয়-বিক্রয়'। 'বাই' শব্দটি একই সাথে 'ক্রয়-বিক্রয়' উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়। পরিভাষায় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিক্রমে দুটি বস্তুর পরস্পর বিনিময়কে 'ক্রয়-বিক্রয়' বলা হয়। ক্রয়-বিক্রয়ের গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বনবী (সা.) বলেন- ‘উত্তম উপার্জন হচ্ছে কল্যাণকর ক্রয়-বিক্রয়।' (মুসনাদে আহমাদ : ১৫২৭৬) ক্রয়-বিক্রয় চার প্রকার: সহীহ, ফাসিদ, মাকরুহ ও বাতিল। নিম্নে এগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো-
সহীহ
যে ক্রয়-বিক্রয় মৌলিক ও আনুষঙ্গিক উভয় বিচারে শুদ্ধ। মৌলিক মানে রুকন বিদ্যমান এবং আনুষঙ্গিক মানে ইজাব-কবুলের সময় দ্রব্যের পরিমাণ ও মূল্য নির্দিষ্ট থাকা ইত্যাদি। এতে ইজাব-কবুলের পর ক্রেতা পণ্যের মালিক হয়।
ফাসিদ
যে ক্রয়-বিক্রয় মৌলিকত্বের বিচারে শুদ্ধ কিন্তু আনুষঙ্গিক বিচারে অশুদ্ধ। যেমন অনির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্য পরিশোধের শর্ত। এ ধরনের লেনদেন ভেঙে ফেলা উত্তম, নচেৎ সুদী কারবার গণ্য হবে।
মাকরুহ
মৌলিক ও আনুষঙ্গিক উভয় দিক থেকে শুদ্ধ, তবে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে (যেমন জুমার দ্বিতীয় আযানের সময় ক্রয়-বিক্রয়)। এতে লেনদেন হয় তবে গুনাহ হয়।
বাতিল
মৌলিক বিবেচনায়ই অশুদ্ধ; যেমন লাশ বা স্বাধীন মানুষ বিক্রি করা।
মাওকুফ
যেখানে পণ্য অন্যের মালিকানাধীন, মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে বৈধ হয়, অন্যথায় বাতিল।
মুকায়াযা, সরফ, সালাম, মুতলাক
মুকায়াযা: দ্রব্যের বিনিময়ে দ্রব্য (যেমন কাপড়ের বিনিময়ে খাদ্য)।
সরফ: মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা (স্বর্ণ-রৌপ্য)।
মুতলাক: মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য (নগদ বা বাকি)।
সালাম: অগ্রিম মূল্য প্রদান করে দ্রব্য বাকি রাখা।
সরফ: মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা (স্বর্ণ-রৌপ্য)।
মুতলাক: মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য (নগদ বা বাকি)।
সালাম: অগ্রিম মূল্য প্রদান করে দ্রব্য বাকি রাখা।
মুসাওয়ামাহ, মুরাবাহা, তাওলিয়াহ, ওযীয়া
মুসাওয়ামাহ: দর কষাকষির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ।
মুরাবাহা: ক্রয়মূল্যের উপর লাভ রেখে বিক্রয়।
তাওলিয়াহ: ক্রয়মূল্যেই পণ্য বিক্রি করা।
ওযীয়া: লোকসানে বিক্রয় করা।
মুরাবাহা: ক্রয়মূল্যের উপর লাভ রেখে বিক্রয়।
তাওলিয়াহ: ক্রয়মূল্যেই পণ্য বিক্রি করা।
ওযীয়া: লোকসানে বিক্রয় করা।
ক্রয়-বিক্রয়ের শর্তাবলি
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলমান নিজেদের পারস্পারিক শর্ত মেনে চলবে কিন্তু হারাম শর্তকে হালাল করবে না।' (দারে কুতনি : ২৯৩১) শর্তসমূহ: ক্রেতা-বিক্রেতা বিবেকসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক; পণ্য ব্যবহারযোগ্য, মজুদ, মূল্যবান, পবিত্র; পরিমাণ ও গুণাগুণ জ্ঞাত; নির্দিষ্ট ও হস্তান্তরযোগ্য; মূল্য নির্দিষ্ট; ইজাব-কবুলের সামঞ্জস্য; সুদমুক্ত হতে হবে ইত্যাদি।
আল্লাহর আরও আদেশ ও নিষেধ
যেসব কাজ নিষিদ্ধ: আত্মহত্যা, অন্যায়ভাবে হত্যা, অন্যের অর্থ সম্পদ আত্মসাৎ, আমানতের খিয়ানত, ওজনে ঠকানো, সুদ, ঘুষ, জুয়া, চুরি-ডাকাতি, অপব্যয়, যুলুম-অত্যাচার, অহংকার, রিয়া (দেখানো ভালো কাজ), গীবত, অপবাদ, মিথ্যা কথা ও মিথ্যা সাক্ষ্য, গান-বাজনা, প্রাণীর ছবি আঁকা, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীল কাজ, প্রবৃত্তির অনুগত্য, নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ নারীদের সাথে বিবাহ (যেমন মা, বোন, খালা, ফুফু, পুত্রবধূ, একত্রে দুই বোন ইত্যাদি), মুশরিক নারীকে বিবাহ, মদ ও মাদকদ্রব্য, তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য গণনা, গণকের কথা বিশ্বাস, মৃত পশু, শূকরের গোশত, রক্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে যবাইকৃত পশু, হিংস্র জন্তুর মাংস ইত্যাদি।
আল্লাহ যেসব কাজের নির্দেশ দিয়েছেন: জ্ঞান অর্জন, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা, মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণা, হালাল জীবিকা অন্বেষণ, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা, সকল নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া, তাঁর আনুগত্য করা, নিষেধাজ্ঞা পরিহার করা, একমাত্র আল্লাহর জন্য নত হওয়া, সাহায্য প্রার্থনায় একমাত্র আল্লাহকে ডাকা, আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আনুগত্য না করা, এবং শুধু আল্লাহকেই ভয় করা।
আল্লাহ যেসব কাজের নির্দেশ দিয়েছেন: জ্ঞান অর্জন, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা, মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণা, হালাল জীবিকা অন্বেষণ, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা, সকল নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া, তাঁর আনুগত্য করা, নিষেধাজ্ঞা পরিহার করা, একমাত্র আল্লাহর জন্য নত হওয়া, সাহায্য প্রার্থনায় একমাত্র আল্লাহকে ডাকা, আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আনুগত্য না করা, এবং শুধু আল্লাহকেই ভয় করা।
🤲 উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নাম নয় বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও রাসূলের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করাই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার চাবিকাঠি। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা ও সুদমুক্ত লেনদেন একটি সমাজকে দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত রাখে। একইভাবে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আসুন আমরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আমাদের জীবন গড়ার চেষ্টা করি, হারাম বর্জন করি এবং হালাল উপার্জন ও নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
📚 পড়তে থাকুন: ইসলামে করনীয় ও বর্জনীয় কাজ (পর্ব-০১)